লাইলাতুল কদর রাতটি চেনার কিছু আলামত।
১. লাইলাতুল কদরের পরিচয় ও অর্থ
'লাইলা' অর্থ রাত এবং 'কদর' অর্থ হলো সম্মান, মাহাত্ম্য বা ভাগ্য। পারিভাষিক অর্থে লাইলাতুল কদর হলো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এমন একটি রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। একে 'ভাগ্যের রজনী'ও বলা হয়, কারণ এই রাতে পরবর্তী এক বছরের জন্য মাখলুকাতের তাকদির বা ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়।
২. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উৎপত্তির কারণ
লাইলাতুল কদরের ইতিহাস সরাসরি আল-কুরআন নাজিলের সাথে সম্পৃক্ত।
- কুরআন নাজিল: ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে রমজান মাসের এই রাতে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর ওপর হেরা গুহায় প্রথম পবিত্র কুরআনের আয়াত নাজিল হয়।
- পূর্ববর্তী উম্মতের তুলনায় মর্যাদা: হাদীস অনুযায়ী, মহানবী (সা.) যখন পূর্ববর্তী উম্মতদের দীর্ঘ হায়াত (যেমন বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি ১০০০ মাস ইবাদত করেছিলেন) সম্পর্কে জানতে পারলেন, তখন তিনি চিন্তিত হলেন যে তাঁর উম্মত অল্প হায়াত নিয়ে তাদের সমান সওয়াব কীভাবে পাবে। তখন আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে উপহারস্বরূপ লাইলাতুল কদর দান করেন।
৩. পবিত্র কুরআনের রেফারেন্স
কুরআনে এই রাতের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল হয়েছে।
সূরা আল-কদর:
"নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাজিল করেছি মহিমান্বিত রাতে। আর আপনি কি জানেন মহিমান্বিত রাত কী? মহিমান্বিত রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতারা ও রূহ (জিবরাঈল) অবতীর্ণ হয় তাদের রবের নির্দেশক্রমে সব কাজের জন্য। শান্তিময় সেই রাত ফজরের উদয় পর্যন্ত।" (সূরা কদর, আয়াত ১-৫)
এছাড়াও সূরা আদ-দুখানে আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই আমি এটি একটি বরকতময় রাতে নাজিল করেছি।" (আয়াত: ৩)
৪. হাদিসের আলোকে গুরুত্ব ও ফজিলত
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রাতের অনেক ফজিলত বর্ণনা করেছেন:
- গুনাহ মাফ: "যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদত করবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
- বঞ্চিত হওয়া দুর্ভাগ্যের লক্ষণ: রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি এই রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে সমগ্র কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো।" (সুনানে ইবনে মাজাহ)
৫. রাতটি কবে? (কদর সন্ধানের সময়)
নির্দিষ্টভাবে লাইলাতুল কদর কবে তা গোপন রাখা হয়েছে যাতে মুমিনরা পুরো রমজান ইবাদতে মশগুল থাকে। তবে হাদিসে কিছু স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে:
- রমজানের শেষ দশকে: রাসূল (সা.) বলেছেন, "তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।" (সহীহ বুখারী)
- বেজোড় রাতগুলো: বিশেষ করে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতে হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে ওলামাদের অনেকের মতে ২৭শে রমজানে হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
৬. এই রাতের বিশেষ আমলসমূহ
লাইলাতুল কদরে বিশেষ কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, তবে নিম্নলিখিত ইবাদতগুলো করা উত্তম:
১. নফল নামাজ: দীর্ঘ কিরাত ও সিজদায় তাহাজ্জুদ ও সালাতুত তাসবীহ পড়া।
২. কুরআন তেলাওয়াত: কুরআন নাজিলের রাত বিধায় এর তেলাওয়াত ও অর্থ অনুধাবন করা।
৩. জিকির ও দোয়া: তাসবীহ পাঠ এবং কান্নাকাটি করে দোয়া করা।
৪. ইতিকাফ: রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে অবস্থান করা কদর পাওয়ার সর্বোত্তম উপায়।
৭. কদরের রাতের বিশেষ দোয়া
হযরত আয়েশা (রা.) রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে কদরের রাতে তিনি কী দোয়া করবেন। রাসূল (সা.) তাকে এই দোয়াটি শিখিয়েছিলেন:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
(আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি)
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (তিরমিযী)
৮. এই রাতের তাৎপর্য
- এটি উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উপহার।
- এক রাতের ইবাদত ৮৩ বছর ৪ মাসের চেয়েও বেশি সওয়াব বয়ে আনে।
- ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং ইবাদতকারীদের জন্য শান্তির দোয়া করেন।
